গল্প

                                  পরী!!!

ভুত আমি বিশ্বাস করিনা। কিন্তু জ্বীন বলে একটা জাতি আছে; তা আমি মানি। কেননা পবিত্র কোরআনে আল্লাহ জ্বীন জাতি সম্পর্কে বলেছেন। 
এসব ভুত বা জ্বীন বিষয়ক কথা কেন উঠছে তার একটা কারন আছে। ঘটনাটা খুলেই বলি। আমার ইন্টারমেডিয়েট জীবনের বন্ধুদের মধ্যে একজন ছিল মনোয়ার ভাই। বয়সে বড় বলে মনোয়ার ভাই বলে সম্বোধন করতাম। আমি আর আমার আরেক বন্ধু সাখাওয়াত ছিলাম একটু দুষ্ট প্রকৃতির। সবসময়ই আমরা তাকে নিয়ে মজা করতাম। তো আমরা একদিন মনোয়ার ভাইকে নিয়ে আড্ডা দিচ্ছি- এমন সময় খেয়াল করলাম মনোয়ার ভাইর হাতে অনেকগুলো আঁচেড়ের দাগ; মনে হচ্ছিল যেন কেউ ধারালো তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে তার হাতটাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। 
প্রসঙ্গ টেনে বললাম- আপনার হাতে এগুলো কিসের দাগ? জিজ্ঞেস করতেই তার চেহারা অন্যরকম হয়ে গেল। কিছু বললনা। আমরাও নাছড় বান্দা; আবার জিজ্ঞেস করলাম। সে বলল- বললে আপনারা বিশ্বাস করবেন? 
- বিশ্বাস করবোনা কেন? আমরা একসঙ্গে বললাম। 
- এ দাগগুলো পরীর নখের আঁচড়। সংক্ষেপে উত্তর দিলেন। 
- পরীর নখের আঁচড়? অবাক হয়ে বললাম। 
এদিকে সাখাওয়াত হাসতে শুরু করেছে। আমি চোখের ইশারায় ওকে চুপ থাকতে বললাম। 
- হ্যাঁ। পরীর নখেরই আঁচড়। তিনি আবার বললেন। 
সাখাওয়াত বলে উঠল- আমি বিশ্বাস করিনা। আমি বললাম- এই চুপ থাকতো ! মনোয়ার ভাই ঘটনাটা খুলে বলুনতো দেখি। 
- বলে আর কি লাভ? যা হয়ে গিয়েছে তা আর মনে করতে চাইনা। 
একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন। আমি চেপে ধরলাম- ভাই আপনাকে বলতেই হবে। 
তিনি শুরু করলেন এভাবে.................... 
তখন আমি ২০০৩ সালে S.S.C পরীক্ষার্থী। মিনা বাজারে আমাদের দোকান ছিল । প্রায়ই আমাকে দোকানে যেতে হতো। তো একদিন দোকান বন্ধ করতে অনেক রাত হয়ে যায়। রাত প্রায় ১২.৩০। আমি বরাবরই সাহসী ছিলাম। কো ন ভয় আমার মধ্যে কাজ করতো না। বাড়ির পথে হাঁটছি। আমাদের বাড়ির রাস্তার দু'পাশেই বড় বড় সুপারির বাগান। ঘন অন্ধকারের মধ্য দিয়ে হাঁটছি। চারদিক নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে রাতজাগা পাখিরা ডেকে উঠছে। হালকা ভয় অনুভব করছি। হাতে ছোট্ট একটা টর্চ লাইট। ঘন কুয়াশায় লাইটের আলো তেমন বোঝা যায়না। পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ শুনতেই পাশে তাকালাম। দেখি একটা বাদুড় সুপারী গাছের মাথায় ডানা ঝাপটাচ্ছে। ভয়ে আমার শরীরের প্রতিটি লোম খাড়া হয়ে গেল। মনে মনে আমি দোয়া পড়ছি আর হাঁটছি। খেয়াল করলাম বাদুড়টা আমার সাথে সাথে আসছে। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই বাদুড়টাকে আর দেখলাম না। হঠাৎ একটা বিড়াল আমার পথ আগলে দাঁড়ালো। কিছু মনে না করেই লাথি মেরে বিড়ালটাকে তাড়িয়ে দিয়ে নিজের ঘরে পৌছলাম। ব্যপারটা কাউকে না জানিয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে নিজ রুমে চলে এলাম। যেইনা ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি তখনি আমার শরীর ভার হয়ে এল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা আলোর বিচ্ছুরন ঘটল। দেখতে পেলাম একটা অপরূপ মেয়ে আমার বিছানায়। আমার দিকে অপলক নয়নে তাকিয়ে আছে। আমিতো ভয়ে কাঠ। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, কে তুমি? এখানে কেন এসেছ? 
- আমি পরী। এসেছি তোমার কাছে। 
- পরী (অবাক হয়ে বললাম)! আমার কাছে কি চাই? 
- তোমাকে আমার খুব ভালো লেগেছে। আমি তোমাকে চাই। 
ততক্ষনে আমার ভয় খানিকটা কেটে গেছে। প্রতুত্তরে বললাম- ভালো লাগতেই পারে। কিন্তু তুমিতো জ্বীন আর আমি মানুষ। কিভাবে সম্ভব বলো। আর আমিইবা তোমাকে পছন্দ করতে যাব কেন? 
- দেখ আমি এগুলো কিছু শুনতে চাইনা। তোমাকে আমার ভালো লেগেছে ব্যস। 
- অসম্ভব। আমি কখখনো তা পারবোনা। 
-দেখ বেশী বাড়াবাড়ি করোনা। এর পরিণতি ভালো হবেনা। আমি যা বলি তা করি। 
দ্রুত চিন্তা করলাম। এখন ওর কথামতো চলতে হবে। নইলে বিপদ হতে পারে। বললাম- আমাকে একটু ভাবতে দাও। 
-ঠিকাছে। তুমি ভাবতে থাকো আমি কাল আবার আসবো। একথা বলে সে নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল। 
ভাবতে থাকলাম আমার এ খন কি করা উচিত। ব্যপারটা কী বাসায় জানাবো? যদি কোন অঘটন ঘটে! না থাক। আপাতত জানিয়ে কাজ নেই। পরবর্তীতে দেখা যাবে। রাতে আর ঘুম হলোনা। সকালের দিকে তন্দ্রা ভাব আসতেই একটা দুঃসপ্ন দেখলাম। ঘুম ছুটে গেল। বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বসলাম। কিছুতেই ভুলতে পারছিলামনা গতরাতের ব্যপারটা। দুঃস্বপ্নের মত মনে হচ্ছে। 
আজ কাউকে ব্যপারটা জানালাম না। হাসি-তামাশা করবে ভেবে। সারাদিন কোন সমস্যা হলনা । সন্ধ্যা হতেই শরীরটা ছমছম করে ওঠলো। ভয় করতে লাগলো। রাতে খাওয়া-দাওয়া করে দোয়া-দরুদ পড়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম। যখন তন্দ্রা ভাব আসলো তখনই আলোর বিচ্ছুরণ দিয়ে পরীটি হাজির হল। আমি ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। আমাকে ভতি-সন্ত্রস্ত দেখে মেয়েটা হেসে উঠল। আমাকে আশ্বাস দিয়ে বলল, ভয়ের কিছু নেই। আমি তোমার কোন ক্ষতি করবোনা। তবুও আমি ভয় কাটিয়ে উঠতে পারিনি। 
- দেখ আমি তোমার কোন ক্ষতি করতে আসিনি। শুধু একটু ভালোবাসা দাও আমায়। আর কিছুই চাইনা। 
- আমি তোমাকে কীবাবে বুঝাবো এটা কখনো সম্ভব নয়। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও। 
মুহুর্তেই ও জ্বলে উঠলো- ব্যস। অনেক হয়েছে। আমি তোমাকে একবার বলেছি আমি যা চাই তাই করি। বুঝতে পারছো আমি কি বলতে চাচ্ছি? 
আমি নিশ্চুপ। 
সে আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। বুঝা যাচ্ছে সে আমাকে মনে প্রানে চাইছে। বলা বাহুল্য, এরকম অপরূপ নারী জীবনে দেখিনি। 
হঠাৎ সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি যতই নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি ততই আমি নিস্তেজ হয়ে পড়ছি। কিন্তু এটাতো আমার যৌবন বয়স। সে তো আর বাঁধা মানেনা। শেষ পযৃন্ত আমাকে হার মানতেই হল। 
এভাবে প্রতি রাত চলতে থাকলো। খেয়াল করলাম, আমি দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছি। শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছি। পন করলাম, এভাবে আর নয়। এর একটা বিহীত করতেই হবে। 
একদিন সকালে আমি বাসার সবাইকে ঘটনাটা খুলে বললাম। শুনেই মা আতঙ্কিত কণ্ঠে বললেন, এটা এতদিন চেপে রেখেছিস কেন? বড্ড ভুর করেছিস! যাক আজই এর একটা ব্যবস্থা করতে হবে। তুই কোন টেনশন করিসনা। ইনশাআল্লাহ্, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। 
বাবা ওইদিন একজন হুজুর নিয়ে এলেন। আমার সব কথা শুনলেন। পরে আমাকে তাবিজ দিলেন ও ঝাড়ফুক করলেন। 
কয়েকদিন ও আর আমার কাছে এলোনা। আমি আবার সুস্থ হয়ে উঠলাম। এরই মধ্যে একদিন ও এসে হাজির। আমার দিকে অগ্নি দৃষ্টি হেনে বলল, তাবিজ নিয়েছিস? কোন লাভ হবেনা। এই বলে ও আমার ওপর ঝাপিয়ে পড়ল। আমার পুরো শরীর নখ দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে দিল। আমার সারা শরীর থেকে রক্ত ঝরতে লাগলো। আমি অজ্ঞান হয়ে পড়লাম। 
পরদিন জ্ঞান ফিরলে নিজেকে হসপিটালে আবিষ্কার করলাম। শিয়রে মা বসে কাঁদছেন। আমিও হু-হু করে কেঁদে উঠলাম। বাবা আমাকে সান্তনা দিলেন। 
যাহোক, বাবা আমার জন্য অনেক হজুর-কবিরাজের কাছে যাচ্ছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছেনা। ও আমাকে যণ্ত্রনা দিয়েই চলেছে। এরই মাঝে মাঝে ও আমাকে এমনসব জায়গায় নিয়ে যেত যেখানে আমি কখনোই যাইনি। 
একদিন বাবা একজন হুজুর নিয়ে এলেন। তিনি আমার সব কথা শুনলেন। তিনি অনেক্ষণ চোখ বন্ধ করে কিসব দোয়া পড়লেন। বললেন, যাও বাবা, ও আর আসবেনা তোমার কাছে। এরপর হুজুর চলে গেলেন। 

ওইদিন রাতে ও আবার এল আমার কাছে। বলল, এখন তোকে কে বাচাঁবে? হ্যাঁ, আমি চলে যাচ্ছি। তবে এভাবে নয়। তোর একটা ক্ষতি করেই ছাড়বো। এই বলে ও আমাকে একটানে ঘরের বাইরে নিয়ে এল। আমাদের বাড়ির পাশে একটা তাল গাছ ছিল। ও আমাকে ঐ তাল গাছের মাথায় নিয়ে গেল। আমি যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকলাম। কিন্তু ওর মন একটুও গললো না। আমাকে নিচে ফেলে দিল। আমি জ্ঞান হারালাম। 
এটুকু বলে মনোয়ার ভাই চুপ হয়ে গেলেন। আমি বললাম- তারপর কি হলো মনোয়ার ভাই? 
- তারপর আমার কিছু মনে নেই। দু'বছর স্মৃতিশক্তি ছিলনা। এর মাঝের ঘটনা আমি জানিনা। তবে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি যা বলেছিলেন সেটা ছিলো এরকম- 
সকালে মা আমাকে ঘরে না পেয়ে খোঁজাখুজি শুরু করে দিলেন। পরে আমাকে তালগাছের নিচে পেল। তিনি আমাকে দেখে মুষড়ে পড়লেন। আমার সারা শরীর হীম হয়ে গেছে। নিশ্বাস বন্ধ। সবাই ভাবলো আমি মারা গেছি । পাড়া-প্রতিবেশী সবাই আমাকে দেখতে এল। আমার শোকে সবাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। 
যখন আমাকে গোসল করানো হবে ঠিক তখনই আমি হেঁচকি দিয়ে উঠলাম। শরীর নাড়া দিল। সবাইতো অবাক। কেউ ভাবেনি যে আমি জীবিত। অনেকে ভয়েই ছিটকে পড়লো। 
তারপরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। খুব দ্রুত আমাকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হলো। প্রায় দু'বছর স্মৃতিশক্তি ছিলনা। আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠলাম। ডাক্তার আমাকে পড়ালেখা করতে নিষেধ করেছিল। কিন্তু আমি তা করিনি তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। এই হলো আমার সংক্ষিপ্ত ঘটনা। বিশ্বাস করা বা না করা আপনাদের ব্যপার। 
মনোয়ার ভাই কথা শেষ করলেন। পরে আমাদের আড্ডা ভাঙ্গলো হল সুপারের বকাতে। 
পরদিন বিকালে সখাওয়াতের সাথে দেখা। বলল, যাই বলিস দোস্ত কথাটা আমার বিশ্বাস হয় নাই। আমিও সায় দিলাম- আমারও না। বেটা চাপাবাজ। 
এ ঘটনার কয়েককদিন পর আমরা বন্ধুরা সবাই মিলে কুমিল্লা কোটবাড়িয়া ভ্রমনে গেলাম। ওখানে জম্পেশ মজা করলাম। পরদিন ফিরে এলাম। রুমে বসে বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিচ্ছি এমন সময় মনোয়ার ভাই বললো, রায়হান, আপনার সাথে একটু কথা আছে এদিকে আসেন। তো আমি গেলাম। বললেন- রায়হান, আমি একটা ভুল করে ফেলেছি। এখন কি করবো? 
- কি ভুল হয়েছে? আগেতো সেটা বলুন? 
- আপনাদের যে ওইদিন আমার ঘটনা বললাম মনে আছে? 
-থাকবেনা কেন? আলবৎ মনে আছে! 
- ভাই, সেদিন হুজুর আমাকে কিছু তাবিজ দিয়ে বলেছিল, আমি যদি কখনো পাহাড়-পর্বত, নদী-সাগরে যাই তখন যেন এই তাবিজ গুলো নিই। কিন্তু আমিতো সেদিন ওইগুলো নেই নি। এখন যদি কিছু হয়! 
- ধুর! কিচ্ছু হবেনা। আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন।- আমি স্বান্তনা দিলাম। 
এরপর আমরা কয়েকদিন মনোয়ার ভাইয়ের খোঁজ পাইনি। টেস্ট পরীক্ষা হয়ে গেল। সে পরীক্ষা দিলনা। ভাবলাম কোন সমস্যা হলোনা তো! 
পরদিন আমি আর সাখাওয়াত মনোয়ার ভাইয়ের বাড়িতে গেলাম। প্রথমেই এক বয়স্কা মহিলাকে দেখতে পেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, মনোয়ার বাড়িতে আছে কি না? তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কারা? 
- আমরা মনোয়ার ভাইয়ের বন্ধু। ও কোথায়? 
একথা বলতেই ওর মা কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, ও তো স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে। কাউকে চিনতে পারেনা। যাও বাবারা, ও পাশের রুমেই আছে। দেখে এসো। 
ওর মায়ের কথা শুনে আমরা তাজ্জব হয়ে গেলাম। তাড়াতাড়ি ওকে দেখতে গেলাম। দেখি ও বাইরে তাকিয়ে আছে একমনে। আমরা ডাকলাম। আমাদের চিনতে পারলো না। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আমাদের দিকে। কষ্টে বুকটা ভরে গেল। সইতে না পেরে চলে এলাম। 
এইতো সেদিনও তো ভালছিল। ভাবলাম এই পৃথিবীতে আজব কত কিছুইনা ঘটে! 
মনোয়ার ভাইয়ের ঘটনাটা বিশ্বাস করলাম। তবে ওকে হারিয়ে.........................